সংখ্যায় লেখা প্রকৃতি
প্রকৃতি ভীষণ রহস্যময়, আর সেই রহস্যময় প্রকৃতিকে ডিকোড করার ভাষা হলো গণিত।
একটু মন দিয়ে দেখলে চারপাশে চোখে পড়বে লুকিয়ে থাকা সংখ্যা আর তাদের জ্যামিতিক প্যাটার্ন। সংখ্যার জগতের তেমনই এক সুপরিচিত অধ্যায় হলো ফিবোনাচ্চি রাশিমালা (Fibonacci sequence)। মধ্যযুগের ইতালীয় গণিতবিদ লিওনার্দো অফ পিসা, যিনি ফিবোনাচ্চি নামে বেশি পরিচিত, ১২০২ সালে তাঁর বিখ্যাত বই Liber Abaci-তে এই রাশিমালা উল্লেখ করেন করেন। নিয়মটা সহজ, অথচ এর ভেতর থেকে একের পর এক চমকপ্রদ প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে।
আগের দুইয়ের যোগফল
ফিবোনাচ্চি রাশিমালা শুরু হয় \(0\) থেকে, আর এরপর প্রতিটি সংখ্যা হলো তার আগের দুই সংখ্যার যোগফল। তাই রাশিমালাটা দাঁড়ায়,
0, 1, 1, 2, 3, 5, 8, 13, 21, 34, 55, 89 …
যেমন পঞ্চম সংখ্যা \(3\), যা তার আগের দুই সংখ্যা \(2\) আর \(1\)-এর যোগফল। নিচে টেনে দেখুন, প্রতিটা নতুন সংখ্যা ঠিক আগের দুটোর যোগফল।
লুকানো ফিবোনাচ্চি
রাশিমালার ভেতরে অনেক মজার বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে আছে।
যেমন, রাশিমালার ১২তম সংখ্যা হলো \(89\)। মজার ব্যাপার, \(1\)-কে \(89\) দিয়ে ভাগ করলে দশমিকের পর ফিবোনাচ্চি সংখ্যাগুলোই একে একে উঁকি দেয়,
1 / 89 = 0.011235955…
প্রতিটা ফিবোনাচ্চি সংখ্যাকে এক ঘর করে ডানে সরিয়ে যোগ করলে ঠিক \(\tfrac{1}{89}\)-এর দশমিকটাই তৈরি হয়।
ইন্টারেস্টিং না?
এবার, পরপর পাঁচটা ফিবোনাচ্চি চিন্তা করুন। প্রথম ও চতুর্থটার গুণফল থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয়টার গুণফল বিয়োগ করুন। কি, উত্তর \(+1\) বা \(-1\)?
আবার \(8, 13, 21, 34, 55\) নিলে \(8 \times 34 - 13 \times 21 = 272 - 273 = -1\)। মান সবসময় \(\pm 1\), শুধু চিহ্নটা বদলায়।
অন্যদিকে, ফিবোনাচ্চি সংখ্যাগুলোর এককের ঘরের অঙ্কগুলোও কিন্তু একই যোগের নিয়ম মানে। যেমন \(13, 21, 34, 55, 89, 144, 233, 377, 610, 987\) এর শেষ অঙ্কগুলো হলো \(3, 1, 4, 5, 9, 4, 3, 7, 0, 7\)। খেয়াল করুন, \(3+1=4,\ 1+4=5,\ 5+9=14\) (শেষ অঙ্ক \(4\))… এরাও আগের দুইয়ের যোগফল, শুধু দশের ঘরটা বাদ।
আরও মজার ব্যাপার হলো, এই শেষ অঙ্কগুলো ঠিক \(60\) ধাপ পরপর আবার একই ক্রমে ফিরে আসে। অনেক দূরের পরপর কয়েকটা ফিবোনাচ্চি সংখ্যা দেখুন,
শেষ অঙ্কগুলো আবার \(0, 1, 1, 2, 3, 5\), অর্থাৎ রাশিমালার শুরুর সেই ক্রমই ফিরে এসেছে।
আচ্ছা, যেকোনো পরপর দুটো ফিবোনাচ্চি সংখ্যার বর্গ যোগ করলে কি পাওয়া যাবে? যেকোনো পরপর দুটো ফিবোনাচ্চি সংখ্যার বর্গ যোগ করলে আবার একটা ফিবোনাচ্চি সংখ্যাই পাওয়া যায়।
ফলগুলো \(2, 5, 13, 34\), সবই ফিবোনাচ্চি সংখ্যা।
আর শুরু থেকে পরপর সংখ্যাগুলোর বর্গ যোগ করতে থাকলে ফল হয় পরপর দুটো ফিবোনাচ্চি সংখ্যার গুণফল।
কেন এমন হয়? নিচের ছবিটা দেখুন। বাহু \(1, 1, 2, 3, 5, 8\) এককের বর্গক্ষেত্রগুলো পাশাপাশি সাজালে ঠিক একটা \(8 \times 13\) আয়তক্ষেত্র তৈরি হয় — বর্গগুলো টালির মতো আয়তক্ষেত্রে এঁটে যায়। সাধারণভাবে বললে,
\(1^2 + 1^2 + 2^2 + \cdots + F_n^2 = F_n \times F_{n+1}\)
আয়তক্ষেত্রটা সবসময় \(F_n \times F_{n+1}\) মাপের। এই দুই বাহুর অনুপাত \(\dfrac{F_{n+1}}{F_n}\) — ঠিক পরপর দুটো ফিবোনাচ্চি সংখ্যার ভাগফল। এই ভাগফল কোথায় গিয়ে মেলে, সেটাই পরের অধ্যায়ের প্রশ্ন।
আয়তক্ষেত্রটা \(8\) উঁচু আর \(13\) (\(=5+8\)) চওড়া। তাই \(1^2+1^2+2^2+3^2+5^2+8^2 = 8 \times 13 = 104\)।
সংখ্যার ভাগফল যেখানে মিলায়
আগের অধ্যায়ে প্রশ্নটা রেখে এসেছিলাম: পরপর দুটো ফিবোনাচ্চি সংখ্যার ভাগফল \(\dfrac{F_{n+1}}{F_n}\) কোথায় গিয়ে থামে? চলুন হাতে গুনে দেখি।
ছোটটা দিয়ে বড়টাকে ভাগ করতে থাকি। শুরুতে ভাগফল বেশ লাফালাফি করে: প্রথমে \(1\), লাফ দিয়ে \(2\), নেমে \(1.5\)। একবার বেশি, একবার কম।
| \(F_n\) | \(F_{n+1}\) | ভাগফল \(F_{n+1}/F_n\) |
|---|---|---|
| 1 | 1 | 1.000000 |
| 1 | 2 | 2.000000 |
| 2 | 3 | 1.500000 |
| 3 | 5 | 1.666667 |
| 5 | 8 | 1.600000 |
| 8 | 13 | 1.625000 |
| 13 | 21 | 1.615385 |
| 21 | 34 | 1.619048 |
| 34 | 55 | 1.617647 |
| 55 | 89 | 1.618182 → |
ভাগফলগুলো দুই দিক থেকে দুলতে দুলতে একটা সংখ্যার কাছে জড়ো হচ্ছে।
দেখুন, ভাগফলগুলো একবার বেশি একবার কম — কিন্তু ভাগফল প্রতিবার ছোট হয়ে আসছে। দুই পাশ থেকে চাপতে চাপতে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার কাছে যাচ্ছে। এই সংখ্যাটার নাম দিই \(\varphi\) (ফাই)।
প্রশ্ন এখন একটাই: \(\varphi\) ঠিক কত? টেবিল দেখে বলব "প্রায় \(1.618\)" — কিন্তু সেটা অনুমান। আসল মানটা বের করব ফিবোনাচ্চির নিজের সংজ্ঞা থেকে। চলুন ধাপে ধাপে।
এই \(\varphi\)-ই সোনালি অনুপাত (Golden Ratio)। টেবিলের ভাগফলগুলো এতক্ষণ ঠিক এই সংখ্যাটার দিকেই ছুটছিল। আর \(\varphi^2 = \varphi + 1\) সমীকরণটা নিজেই একটা চমক লুকিয়ে রেখেছে: \(\varphi\)-কে বর্গ করলে ঠিক \(1\) বাড়ে (\(2.6180339\ldots\)), আর উল্টে দিলে ঠিক \(1\) কমে (\(\tfrac{1}{\varphi} = 0.6180339\ldots\))। দশমিকের ঘরগুলো একটুও নড়ে না। এমন স্বভাবের ধনাত্মক সংখ্যা \(\varphi\) একটাই।
এবার সংখ্যা থেকে জ্যামিতিতে ফিরি। একটি আয়তক্ষেত্র কল্পনা করুন, যার লম্বা বাহু ও ছোট বাহুর অনুপাত ঠিক \(\varphi : 1\)। এই অনুপাতের কারণেই তাকে বলা হয় সোনালি আয়তক্ষেত্র। এখন এর ভেতর থেকে সবচেয়ে বড় বর্গটি কেটে ফেলুন। অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, বাকি অংশটিও আবার একটি সোনালি আয়তক্ষেত্র। অর্থাৎ বড় আয়তক্ষেত্রের ভেতরে লুকিয়ে আছে একই অনুপাতের আরেকটি ছোট আয়তক্ষেত্র। এরপর সেই ছোট আয়তক্ষেত্র থেকেও আবার সবচেয়ে বড় বর্গটি কেটে ফেলুন। আবার একই ঘটনা। আবার সোনালি আয়তক্ষেত্র। আবার একই অনুপাত। এভাবে প্রক্রিয়াটি চলতেই থাকে — প্রতিবার আকার ছোট হয়, কিন্তু অনুপাত বদলায় না। এই পুনরাবৃত্তির ভেতরেই সোনালি অনুপাতের সৌন্দর্য। আর প্রতিটি বর্গের ভেতর যদি এক-চতুর্থাংশ বৃত্তচাপ আঁকা হয়, তাহলে চাপগুলো ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যায়। সেই জোড়া লাগা রেখাই ভেতরের দিকে ঘুরে তৈরি করে সোনালি সর্পিল।
প্রতিবার বর্গ কাটার পর যা পড়ে থাকে, সেটাও আবার সোনালি আয়তক্ষেত্র, আর গল্পটা এভাবে অনন্তকাল চলে। ছবিতে দেখানো যায় এতটুকুই; বাকি পথটুকু সর্পিল নিজেই কেন্দ্রের দিকে গুটিয়ে নেয়।
প্রাচীন গ্রিস থেকে মিশরের পিরামিড, রেনেসাঁর ক্যানভাস থেকে আজকের ডিজাইন স্টুডিও—‘নিখুঁত’ অনুপাতের খোঁজে সোনালি অনুপাতের নাম বারবার ফিরে আসে। কেউ বলে পার্থেনন মন্দিরের গায়ে তার ছায়া আছে, কেউ খুঁজে পায় দা ভিঞ্চির আঁকায়, কেউ আবার আধুনিক লোগো, স্থাপত্য, এমনকি মানুষের মুখের সৌন্দর্যের পেছনেও \(\varphi\)-এর রহস্য দেখতে চায়। বিখ্যাত মানুষের মুখ, নিখুঁত হাসি, চোখ-নাক-ঠোঁটের দূরত্ব—সবকিছুকেই কখনো কখনো সোনালি অনুপাতের মাপে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। শুনতে সুন্দর লাগে, প্যেন পৃথিবীর সৌন্দর্যের পেছনে একটি গোপন সংখ্যা বসে আছে। কিন্তু সত্যি বলতে, এসব দাবির অনেকগুলোই খানিকটা অতিরঞ্জিত। অনেক সময় মানুষ আগে সৌন্দর্য দেখে, তারপর তার মধ্যে \(\varphi\) খুঁজে নিতে চায়। তবে সবচেয়ে নিশ্চিত ঠিকানাটা আমরা এইমাত্র নিজের হাতে বের করেছি: ফিবোনাচ্চি রাশিমালার ভেতরে সোনালি অনুপাত।
যেখানে সংখ্যা গাছে ফোটে
এতক্ষণ তো আমরা সংখ্যার ভেতরেই হাঁটছিলাম। কিন্তু আসল চমকটা শুরু হয় তখন, যখন দেখা যায়—এই একই ছন্দ প্রকৃতির ভেতরেও বারবার ফিরে আসে। যেন কাগজের ওপর লেখা রাশিমালা একসময় গাছের ডাল, ফুলের পাপড়ি, বীজের ঘূর্ণি হয়ে বাইরে ফুটে ওঠে।
সূর্যমুখী ফুলের দিকে তাকালেই ব্যাপারটা সুন্দর বোঝা যায়। তার বীজগুলো এলোমেলোভাবে বসে থাকে না; বরং তারা সাজানো থাকে দুই দিকে ঘুরে যাওয়া সর্পিল রেখায়। সেই সর্পিলগুলো গুনলে অনেক সময় দেখা যায় তারা পরপর দুটো ফিবোনাচ্চি সংখ্যা—যেমন \(34\) ও \(55\), অথবা \(55\) ও \(89\)। প্রতিটি নতুন বীজ আগেরটির থেকে প্রায় 137.5° কোণে বসে। এই কোণটিকেই বলা হয় সোনালি কোণ (Golden Angle)। নিচে বীজের সংখ্যা বাড়িয়ে সেই সর্পিল প্যাটার্নটা নিজে দেখুন।
প্রতিটা বীজ আগেরটার থেকে \(137.5°\) ঘুরে বসছে। এতেই আপনাআপনি ফিবোনাচ্চি সংখ্যার সর্পিল তৈরি হয়ে যায়।
অনেক ফুলের পাপড়ির সংখ্যাও ফিবোনাচ্চি সংখ্যা হয়ে থাকে। প্রকৃতিতে কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, তবে চেনা উদাহরণগুলো এমন,
| ফুল | পাপড়ি |
|---|---|
| লিলি | 3 |
| বাটারকাপ | 5 |
| চিকোরি | 21 |
| ডেইজি | 34 |
পাইন গাছের কোণ আর আনারসের গায়ের চোখ গুনলেও সর্পিলের সংখ্যা সাধারণত \(5, 8\) বা \(13\), অর্থাৎ পরপর ফিবোনাচ্চি সংখ্যা। রোমানেস্কো ব্রকলিতেও একই রকম ফিবোনাচ্চি সর্পিল দেখা যায়।
আরেকটা সুন্দর উদাহরণ মৌমাছির বংশলতিকা। একটি পুরুষ মৌমাছির (ড্রোন) বাবা থাকে না, শুধু মা থাকে। তাই পেছনের দিকে প্রজন্ম গুনতে থাকলে তার পূর্বপুরুষের সংখ্যা দাঁড়ায় \(1, 1, 2, 3, 5, 8, 13\)…, হুবহু ফিবোনাচ্চি রাশিমালা।
গাছের ডালপালা গজানোর ধরনেও অনেক সময় ফিবোনাচ্চি প্যাটার্ন পাওয়া যায়; Sneezewort নামের একটা বুনো ফুল এর পরিচিত উদাহরণ। আর শুধু প্রকৃতি নয়, কম্পিউটার সায়েন্সেও ফিবোনাচ্চি সংখ্যা বারবার আসে, বিভিন্ন অ্যালগরিদম আর ডেটা স্ট্রাকচারে।
প্রকৃতির গোপন সংকেত
ফিবোনাচ্চির এই প্যাটার্ন একবার চোখে পড়লে চারপাশে আরও খুঁজে পেতে শুরু করবেন। নিজেও খুঁজে দেখুন, হয়তো নতুন কোনো প্যাটার্ন আপনার চোখেই প্রথম ধরা পড়বে। প্রকৃতির এই গোপন সংকেতের নামই, The Secret Code of Nature।
- শূন্য: হুমায়ূন আহমেদ